The Web This Blog

Thursday, July 1, 2021

১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর

প্রতিদিনের মত সেইদিনও সকালে সূর্য্য উঠেছিল, কিন্তু সেইদিন চলচিত্রের একটি নক্ষত্র। দিনটি ছিল শুক্রবার বিবিসি বাংলা এর তথ্য অনুসারে যা যানা যায় তার কিছুটা বর্ননা দেয়া যাক। তখন আমি ৯ম শ্রেনীর ছাত্র। ছোট বেলা থেকেই সিনেমা দেখা আমার একটা নেশার মত ছিল। তখন বেশ কয়েকটি সিনেমা দেখা হয়েছিল সালমান শাহ এর। সৃতি হাতরিয়ে যতটুকু মনে আছে এখন, ফুটবল খেলে মাঠ থেকে বিকালে বাসায় আসি। তখন খবরের শিরনামে একটিই খবর প্রিয়নায়ক সালমান শাহ আর নেই। অনেকের মত আমারও কিছুটা কষ্ট হয়েছিল খবরটি মেনে নিতে।

বিয়ের পর সালমান শাহ ইস্কাটনে থাকতেন তার স্ত্রী সামিয়াকে নিয়ে। সেদিন আনুমানিক সকাল সাতটার দিকে বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী সালমানের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। কিন্তু ছেলের দেখা না পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। বাসার নিচে দারোয়ান সালমান শাহ'র বাবাকে তাঁর ছেলের বাসায় যেতে দিচ্ছিল না ।

নীলা চৌধুরীর (সালমানের মা) বর্ণনা ছিল এ রকম, "বলেছে স্যার এখনতো উপরে যেতে পারবেন না। কিছু প্রবলেম আছে। আগে ম্যাডামকে (সালমান শাহ'র স্ত্রীকে) জিজ্ঞেস করতে হবে। এক পর্যায়ে উনি (সালমান শাহ'র বাবা) জোর করে উপরে গেছেন। কলিং বেল দেবার পর দরজা খুললো সামিরা (সালমান শাহ'র স্ত্রী)"

সালমান শাহ'র বাবা সামিরাকে বললেন ইমনের সাথে কাজ আছে, ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল সই করাতে হবে। ওকে ডাকো। তখন সামিরা বললো, আব্বা ওতো ঘুমে। তখন উনি বললেন, ঠিক আছে আমি বেডরুমে গিয়ে সই করিয়ে আনি। কিন্তু যেতে দেয় নাই। কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (সালমানের বাবা) প্রায় ঘণ্টা দেড়েক বসে ছিল ওখানে।

বেলা এগারোটার দিকে একটি ফোন আসে সালমান শাহ'র মা নীলা চৌধুরীর বাসায়। ঐ টেলিফোনে বলা হলো, সালমান শাহকে দেখতে হলে তখনই যেতে হবে। টেলিফোন পেয়ে নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলে সালমান শাহ'বাসায় যান। তবে সালমানের ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে ছেলে সালমান শাহকে বিছানার ওপর দেখতে পান নীলা চৌধুরী। খাটের মধ্যে যেইদিকে মাথা দেবার কথা সেইদিকে পা। আর যেইদিকে পা দেবার কথা সেদিকে মাথা। পাশেই সামিরার এক আত্মীয়ের একটি পার্লার ছিল। সে পার্লারের কিছু মেয়ে ইমনের হাতে-পায়ে সর্ষের তেল দিচ্ছিল।

"আমি দেখলাম আমার ছেলের হাতে পায়ের নখগুলো নীল। তখন আমি আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি, আমার ছেলে তো মরে যাচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নীলা চৌধুরী।

কিছুক্ষন পর ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানকার ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে বলা হয় সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছে।

সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।যদিও সালমানের বাবা-মার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। নীলা চৌধুরীর অভিযোগ ছিল তারা হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে।

পুলিশ বলেছিল, অপমৃত্যুর মামলা তদন্তের সময় যদি বেরিয়ে আসে যে এটি হত্যাকাণ্ড, তাহলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা মামলায় মোড় নেবে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়কের আকস্মিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো দেশ। সে সময় সারা দেশজুড়ে সালমানের অসংখ্য ভক্ত তাঁর মৃত্যু মেনে নিতে না পারায় বেশ কয়েকজন তরুণী আত্মহত্যা করেন বলেও খবর আসে পত্রিকায়। সালমানের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে না পারায় তাঁর ভক্তদের মাঝে তৈরি হয় নানা প্রশ্নের।

সালমান শাহের মৃত্যুকে ঘিরে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠতে থাকে, তখন পরিবারের দাবির মুখে দ্বিতীয়বারের মতো ময়না তদন্ত করা হয়। মৃত্যুর আটদিন পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে তিন সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সে বোর্ডের প্রধান ছিলেন ডা. নার্গিস বাহার চৌধুরী।

ডা. নার্গিস বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "লাশটা আমি দেখেছি মরচুয়েরিতে। আমার কাছে মনে হয়েছে যেন সদ্য সে মারা গেছে। এ রকম থাকলে তাঁর মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে নির্ণয় করা যায়। আত্মহত্যার প্রত্যেকটা সাইন (চিহ্ন) সেখানে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ছিল। তাঁর শরীরে আঘাতের কোন নিশানা ছিল না।"

দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে মামলার কাজ সেখানেই থেমে যায়। সালমান শাহ'র পারিবারিক বন্ধু চলচ্চিত্র পরিচালক শাহ আলম কিরণ বলছিলেন, শেষের দিকে অনেক মানসিক চাপে ছিলেন সালমান শাহ। পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রযোজকদের সাথে বোঝাপড়ার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।

সালমান শাহ'র মৃত্যুর পরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অভাবনীয় ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রযোজকরা লোকসান কমিয়ে আনতে সালমান শাহ'র মতো দেখতে কয়েকজন তরুণকে নিয়ে অসমাপ্ত সিনেমার কাজ সম্পন্ন করার জন্য উঠে-পড়ে লাগেন।

"পুরনো ঢাকার একটি ছেলেকে পেছন থেকে দেখতে সালমানের মতো মনে হয়। তার চুলের স্টাইল দেখতে পেছন দিকে থেকে সালমানের মতো। তখন তার ওপর পুরো ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্ব পড়ে গেল। সালমানের অসমাপ্ত ছবিগুলোতে লং শট, ব্যাক টু ক্যামেরা, ওভার-দ্যা-শোল্ডার শটের মাধ্যমে সে ছেলেটাকে ব্যবহার করা শুরু হলো," বিবিসি বাংলাকে বলেন শাহ আলম কিরণ।

সালমান শাহ'র মৃত্যুর সংবাদ দর্শকদের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে এত বছর পরেও অনেকে তার প্রিয় নায়ককে ভুলতে পারেননি। সালমানের মৃত্যুর দুই দশকের বেশী পরেও তাকে নিয়ে দর্শকদের মাঝে আলোচনা থামেনি।

অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, সালমান শাহ'র বিশেষত্ব কী ছিল? কেনই বা তিনি এতটা অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন?

চলচ্চিত্র বিশ্লেষক এবং বেসরকারি ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক জাকির হোসেন রাজু মনে করেন, সালমান শাহ যে সময়টিতে অভিনয়ে এসেছিলেন, তখন ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ছিল পালাবদলের সময়। ১৯৯২ সালে 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন সালমান শাহ। জনপ্রিয় একটি হিন্দি সিনেমার অফিসিয়াল রিমেক ছিল 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত'। এ সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেন সালমান। পর্দায় তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, সংলাপ বলার ধরন, অভিনয়-দক্ষতা - সবকিছু মিলিয়ে দর্শকের মনে স্থান করে নিতে সময় লাগেনি এ নায়কের। বাংলাদেশের সিনেমায় তিনি 'রোমান্টিক হিরো' হিসেবে পরিচিত পান।

পরিচালক শাহ আলম কিরণ বলেন, "ও যাই করতো, সেটাই ভালো লেগে যেত। অল্প সময়ের মধ্যে এ ছেলেটা চলচ্চিত্রমোদীদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল।"

চলচ্চিত্র বিশ্লেষক জাকির হোসেন রাজু বলছিলেন, ১৯৭০-৮০'র দশকের নায়কদের পরে চলচ্চিত্রে সালমানের আবির্ভাব এক ধরণের তারুণ্যের উচ্ছ্বাস তৈরি করেছিল। তিনি ছিলেন একজন প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতানায়ক রাজ্জাক, আলমগীর এবং ফারুকের পর সে সময় নতুন একদল তরুণ অভিনেতার আবির্ভাব হয়েছিল ঢাকার সিনেমা জগতে।

নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যত নায়কের আবির্ভাব ঘটেছিল তাদের মধ্যে সালমান শাহ সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন বলে উল্লেখ করেন জাকির হোসেন রাজু।

তাঁর বর্ণনায়, সালমান শাহ'র অভিনয়ের মধ্যে দর্শক একটা ভিন্নধারা খুঁজে পেয়েছিল। অনেকে আবার সালমান শাহ'র মধ্যে বলিউড নায়কদের ছায়াও খুঁজে পেয়েছিলেন।

সালমান শাহকে নিয়ে আলোচনা কখনোই থামেনি। মাত্র চার বছরের সিনেমা ক্যারিয়ারে সালমান শাহ বাংলা সিনেমার অভিনয় জগতে নিজের এমন একটি স্থানটি করে নিয়েছিলেন যে তাঁর অভাব এখনো অনুভব করেন দর্শক, পরিচালক, প্রযোজক - সবাই।

এখনো প্রতি বছর সালমান শাহ'র মৃত্যু দিবসে তাঁর অনেক ভক্ত তাঁকে স্মরণ করেন ভালোবাসার সঙ্গে।

আর সালমানের অনেক ভক্তের কাছে তাঁর মৃত্যু এখনো একটি বড় রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে, সালমান শাহের আত্মহত্যার পাঁচটি কারণ হলো-

. চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তার অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা।

. স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ

. বেশি আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা।

. মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা, যা জটিল সম্পর্কের বেড়াজাল তৈরি করে অভিমানে রূপ নেয় এবং

. সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতা।

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ইং সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরে পিবিআই।


প্রথম পাতা


তথ্যসূত্রঃ- বিবিসি বাংলা

Tuesday, June 1, 2021

কালীপদের পাঁচটি ছেলে

হারাধনের দশটি ছেলে

কবিঃ- যোগীন্দ্রনাথ সরকার

কালীপদের পাঁচটি ছেলে

~ রাম কৃষ্ণ সরকার

হারাধনের দশটি ছেলে

          ঘোরে পাড়াময়,

একটি কোথা হারিয়ে গেল

          রইল বাকি নয়।

 

হারাধনের নয়টি ছেলে

          কাটতে গেল কাঠ,

একটি কেটে দুখান হল

          রইল বাকি আট।

 

হারাধনের আটটি ছেলে

          বসলো খেতে ভাত,

একটির পেট ফেটে গেল

          রইল বাকি সাত।

 

হারাধনের সাতটি ছেলে

          গেল জলাশয়,

একটি সেথা ডুবে ম

          রইল বাকি ছয়।

 

হারাধনের ছয়টি ছেলে

          ড়তে গেল গাছ,

একটি মল পিছলে পড়ে

          রইল বাকি পাঁচ।

 

হারাধনের পাঁচটি ছেলে

          গেল বনের ধার,

একটি গেল বাঘের পেটে

          রইল বাকি চার।

 

হারাধনের চারটি ছেলে

          নাচে ধিন ধিন,

একটি মল আছাড় খেয়ে

          রইল বাকি তিন।

 

হারাধনের তিনটি ছেলে

          ধরতে গেল রুই,

একটি খেলো বোয়াল মাছে

          রইল বাকি দুই।

 

হারাধনের দুইটি ছেলে

          মারতে গেল ভেক,

একটি মল সাপের বিষে

          রইল বাকি এক।

 

হারাধনের একটি ছেলে

          কাঁদে ভেউ ভেউ,

মনের দুঃখে বনে গেল

          রইল না আর কেউ।

কালীপদের পাঁচটি ছেলে

       একটি কোথায় চলে গেল,

জানে নাতো কেও

       বাকি রইল চার।

 

কালীপদের চারটি ছেলে

      একটি মরলো বৌয়ের জ্বালায়,

বাকি রইল তিন।

 

কালীপদের তিনটি ছেলে

      একটি মরলো ছেলেকে নিয়ে

রইল বাকি দুই।

 

কালীপদের দুইটি ছেলে

     একটি পাগল মেয়েকে নিয়ে

রইল বাকি এক।

 

কালীপদের একটি ছেলে

     পাঁচটির একটি কেবল পরেই রইলো ,

হারিয়ে গেল চার।

 

Sunday, May 30, 2021

রামাচরন বাগচি ও তার প্রিয় বাছুর (শেষ অংশ)

২০১৬ সালের দিকে মামার কথার অবাধ্য হয়ে রামাচরন চাকরি ছেড়ে দেয়। এতে মামা এতাটাই দুঃখ পায় যে এখন তার সাথে ঠিক ভাবে কথাও বলে না যোগাযোগও করে না। ২০১৬ সালে রামাচরনের সাথে এক রাজহাসের খামার মালিকের সাথে পরিচয় হয়। খামার মালিক তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে তাকে কয়কটি রাজহাসের ডিম দেওয়া হবে এবং সেটা লালন পালন করে ডিম ফুটে বাচ্চা হলে সেটা বিক্রি করে যা লাভ হবে তার তিন ভাগের এক ভাগ রামাচরন পাবে। রামাচরন রাজি হয় কারন তার কোন অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। এবং উল্লেখ থাকে যে খামারে যদি আর্থিক ক্ষতিও হয় তার কোন প্রভাব রামাচরনের উপর পরবে না। কারন খামারের মালিকানা ছিল সেই মালিকের একক নামে।

ছেলেটি দীর্ঘ বছর চাকরি করলেও রাজহাস লালন পালন সম্পর্কে কোন ধারনা বা অভিজ্ঞতা ছিল না। চাকরি ছেড়ে যখন পুরোপুরি খামারের দায়িত্ব রামাচরন পায় তখন দেখে ডিমগুলো রাজহাসের নয় পাতি হাসের। ছেলেটি হতাস হয়। কিন্তু কিছু করার নেই রামাচরন পূজনীয় একজনকে কথা দেয় তার চাকরি করার আর ইচ্ছা নেই। কারন তার গুরুদেব চাকরি করাকে কিছুটা অপছন্দ করতেন। রামাচরন দোটানায় পরে এখন হাবুডুবু খায় হায় হতাশ হয়। চাকরি করবেনা যেমন ঠিক আবার যদি রাজহাসের খামার থেকে চলে যায় তাহলে কর্মচারীদের কি হবে এই ভেবে থেকে যায় রামাচরন।


বাকি অংশ …......

 

রামাচরন বাগচি ও তার প্রিয় বাছুর (প্রথম অংশ)

 

Friday, May 14, 2021

রামাচরন বাগচি ও তার প্রিয় বাছুর (প্রথম অংশ)

ঈদের বন্ধ, ভাবলাম ঘরে বসে বসে কি করা যায়? তাই একটি রুপক গল্প লিখতে বসলাম। আমার কাছে রুপক গল্প লিখতেই বেশি ভাল লাগে কারন এই গল্পগুলো পাঠক নিজের মত পড়ে ও ভাবতে পারেন। অনেক বছর যাবত ব্লোগে লিখে আসছি এমন কিছু রুপক গল্প। দেশ, সমাজ, সমসাময়িক ঘটনা ইত্যাদি বিষয় থাকে আমার সেই গল্পগুলোতে। Indian Daily Soap Opera  গুলো দেখলে বুঝা যায় যার সাথে বাস্তবের মিল আছে ২০% বাকী পুরটাই রুপক বা কল্পনানির্ভর। কিন্তু সাধারন মানুষ এই নাটকগুলোকে এতটাই জীবনের সাথে আপন করে নেয় যে, সবাই সেই নাটকের কোন না কোন চরিত্রের সাথে নিজেকে খুজে পায়।

বাংলাদেশে রুপক গল্পকার হিসেবে আমার একজন ভালোলাগার লেখক হানিফ সংকেত, তিনি সমাজের অনেক ঘটনাকে তার মত করে রুপক আকারে উপস্থাপন করেন। তাই আজকের লেখাটি তাকে উৎসর্গ করলাম।

আজকের গল্পের নায়ক বা প্রধান চরিত্রটি পুরান ঢাকায় জন্ম ও বড় হয়ে উঠা এক কিশোরকে নিয়ে। রামারচরন বাগচি তার নাম, ছেলেটি স্বপ্ন দেখতে ও নতুন নতুন কিছূ আবিস্কার করতে ভালোবাসে। নব্বই দশকে কৈশোর বয়সে যখন টিভিতে সাঁওতালি সুন্দরী কোন মেয়ের নাচ দেখত তখন ভাবতো কোন সাঁওতালি মেয়ে বিয়ে করে পাহাড়ে গিয়ে বসবাস করবে। সুন্দর প্রকতি খাবে-দাবে পাহাড়ে পাহাড়ে বেড়ানো যাবে আর কাজ করবে। জীবনের বেশি কিছু চাওয়ার নাই। কিছুটা বড় হবার পর সেই স্বপ্নটা বাদ পরে গেল।

ঠাকুরমা-র আদরে বেড়ে উঠা ছেলেটি খেলাধুলায় খুব ভাল করতে থাকে, প্রিয় খেলা ফুটবল। প্রিয় খেলয়ার সেই সময়কার ইতালীর Roberto Baggio. স্বপ্ন দেখতে যে ছেলেটি ভালবাসে সময়ের সাথে সাথে এবং সংসারের আর্থিক অনটনের কারনে একে একে স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে থাকে, কারন স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে অনেক তফাত।

বিটিভি তে কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখে তার সখ হলো লেখা পড়া শেষ করে একটি আধুনিক কৃষি খামার দেবার। এস এস সি পরিক্ষা শেষ, ঠাকুরমা বললো কি করা যায়। বসে থেকে তো লাভ নাই রে ভাই। ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে একটি মাত্র গাধা দিয়ে শুরু হলো তার গাধাকে মানুষে পরিনিত করার প্রকল্প। অল্পদিনের মধ্যে তার খামারে বেশ কিছু গাধা-গাধি আসতে থাকে। কয়েক বন্ধু মিলে ভাবতে থাকে একটি বড় গাধাদের খামার দিলে কেমন হয়। কিন্তু আর হয়ে উঠেনি। বেশ কয়কটি গাধা এখন মানুষে পরিনিত হয়েছে এবং দেশের জন্য কাজ করছে।

এইচ এস সি পরিক্ষার পর ভাবতে থাকে কি করা যায়, লেখা-পড়ার পাশাপাশি স্থায়ি কিছু আয় করা যায় কিনা। চাকরি খুজতে খাকে কিন্তু পায় না। ২০০৪ সালের দিকে এক বান্ধবী বললো তোমাকে একটি মুরগীর খামারে নিয়ে যাই। আমি সেখানে মুরগী লালল পালন শিখছি। কারন এখন সারা পৃথিবীতে মুরগীর ব্যপক চাহিদা। ছেলেটি গিয়ে ভর্তি হলো মুরগীর চিকৎসা কিভাবে করা যায় তার প্রশিক্ষন নিতে।

প্রশিক্ষন চলাকালীন তার সাথে অল্প সময়ের মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সবার সাথে সক্ষতা বারতে থাকে। কোর্স শেষ হলে কিছুদিন ইন্টার্নী করে ছেলেটি। তখনই সৌভাগ্যক্রমে সেই প্রতিষ্ঠানের মুরগীর ডাক্তারটি চাকরি ছেড়ে দেয়। কোর্স ফলাফল ভাল থাকায় এবং প্রশিক্ষকের সুদৃষ্টি থাকার ফলে চাকরি পেয়ে যায় ছেলেটি। তখনই প্রশিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে খুবই গভির ভাতৃতের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়।

সময়ের ব্যবধানে আর বেশকিছু খামারে চাকরি করে ছেলেটি। ছেলেটির জীবনে বড় হয়ে উঠার ক্ষেত্রে সেই মুরগীর খামারের প্রশিক্ষক এর ভূমিকা অপরিহার্য। ২০০৭ সালে সেই প্রশিক্ষকের হাত ধরেই আন্তর্জাতিক মানের একটি বাঘের খামারে ছেলেটির চাকরি হয়। বাঘের খামারটি ছেলেটির জীবনকে ব্যপক পরিবর্তন করে দেয়। জীবনকে সে নতুন ভাবে চিনতে শুরু করে। চার বছর সেই খামারে সুনামারে সাথে চাকরি করে ছেলেটি। সেখানে প্রিয় এক বড় ভাইয়ের সাথে তার পরিচয় ও সক্ষতা হয়। জীবন ও তার উদ্দেশ্য ঠিক করতে থাকে ছেলেটি, আর চাকরি নয়, এখন ব্যবসা করতে হবে। হাতে প্রচুর টাকা। সেই প্রিয় ভাইটি বলেছিল চাকরি ছেড়না তুমি, চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করতে থাকো ও শিখতে থাকো। চাকরি নিজের জন্য আর ব্যবসা করবে অপরকে ভাল রাখার জন্য।

শ্রধেয় মুরগীর খামারের সেই প্রশিক্ষকের সাথে কিছুটা অভিমান করে চাকরি ছেড়ে শুরু করলো ব্যবসা, কিন্তু কোনটাই আর লাভের মুখ দেখলো না। একে একে সব ব্যবসা ও জামানো টাকা যখন শেষ। সংসারের কারনে আবার সে একটি কুমিরের চামড়া রপ্তানীর খামারে চাকরি করে। অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে সুনাম অর্জন করে। তার মামা বলেছিল আমি কিছুদিন পর ছোট একটি কুমিরের চামড়া রপ্তানীর খামার দিবো। ভালভাবে কাজ করতে খাকো। কিন্তু সেখানে কিছুতেই ছেলেটির মন বসে না। কারন ছেলেটি একটি ধর্মীয় আদর্শে মানুষ, যেখানে শুধু নিজে ভাল থাকলে চলবে না তোমার সমাজ ও দেশের জন্য কিছু একটা করতে হবে যাতে অন্যকেও ভাল রাখা যায়।

২০১৩ সাল রামাচরন বিয়ে করে মানিকগঞ্জ জেলার কবিতা বালা নামের এক শিক্ষিত মেয়েকে। সেও কিছুদিন যাবত চাকরি করে বেশ টাকা সঞ্চয় করেছে বিয়ের পর নিজে কিছু করার জন্য। কবিতা বালা একদিন বলে, “আমি চাইনা আমার সন্তানরা বড় হয়ে চাকরি করুক।” কিন্তু কি ব্যবসা করবে তাও তারা ঠিক করতে পারছে না। রামাচরন ভাবে তারা একটি নিজের নামে কৃষি খামার দিবে। কারন এই বিষয়েই রামাচরনের বিশেষ জ্ঞান আছে। যেখানে হাস, মুরগি, গরু, হরিন, বাঘ, কুমির সবই পাওয়া যাবে একই খামারে। কবিতা বালা রামাচরনের অনুপ্রেরনায় ঘরে বসে অনলাইনে প্রশিক্ষন নিতে থাকে। কিছুতেই কিছু হয়ে উঠছিলনা কারন যতবার খামার চালু করবে ভাবে ততবারই কোন না কোন সমস্যা রামাচরনকে পিছে ফেলে দেয়।


কি করবে ভাবতে ভাবতে ই চলে যায় জীবনের আরো কয়েকটি বছর …....................


রামাচরন বাগচি ও তার প্রিয় বাছুর (শেষ অংশ)